ভয়াল ২১শে আগস্ট আজ
নিজস্ব প্রতিনিধি রবিবার রাত ০৩:৫৬, ২১ আগস্ট, ২০২২
আজ রক্তাক্ত ২১ আগস্ট। দেশের ইতিহাসে নৃশংসতম হত্যাযজ্ঞের দিন। একটি নারকীয় সন্ত্রাসী হামলার ১৮তম বার্ষিকী। ২০০৪ সালের এইদিনে সভ্য জগতের অকল্পনীয় হত্যাযজ্ঞ চালানো হয় রাজধানীর এক রাজনৈতিক সমাবেশে। আওয়ামী লীগের জনসভায় চালানো গ্রেনেডের হিংসার দানবীয় সন্ত্রাস আক্রান্ত করে মানবতাকে। আক্রান্ত হন স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধুর কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয় প্রাঙ্গণে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কথা বলতে গিয়ে সন্ত্রাসের শিকার হন আওয়ামী লীগ সভাপতি। হামলার ধরণ ও লক্ষ্যস্থল থেকে এটা স্পষ্টত যে শেখ হাসিনাকে হত্যা করাই ছিল ওই গ্রেনেড ও গুলিবর্ষণের উদ্দেশ্য। দলীয় নেতা-কর্মীদের মানববর্মে শেখ হাসিনাকে রক্ষা পেলেও ওই হামলায় দলের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক ও মরহুম রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের সহধর্মিণী বেগম আইভি রহমানসহ ২২ জন নেতা-কর্মী প্রাণ হারান। গ্রেনেড হামলার বিচারের রায়ে তৎকালীন ক্ষমতাসীন বিএনপি জোট সরকারের মন্ত্রী ও সরকারের কর্মকর্তার সম্পৃক্ততায় প্রমাণ মেলে ওই সরকারের প্রত্যক্ষ মদদেই হামলাটি পরিচালিত হয়েছিল।
তখন ক্ষমতায় ছিল বিএনপি-জামায়াত নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার। সেদিন ‘সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ ও দুর্নীতি বিরোধী শান্তি মিছিলের’ আয়োজন করেছিল সেই সময়কার বিরোধী দল আওয়ামী লীগ। আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এতে প্রধান অতিথি ছিলেন। সন্ত্রাস বিরোধী শান্তি মিছিলের আগে বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউর সামনে স্থাপিত অস্থায়ী ট্রাকমঞ্চে দাঁড়িয়ে বক্তৃতার শেষ হওয়ার পরপরই বিকাল ৫টা ২২ মিনিটে তাকে টার্গেট করে উপর্যপুরি গ্রেনেড নিক্ষেপ করা হয়। বিকট শব্দে বিস্ফোরিত হতে থাকে একের পর এক গ্রেনেড। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ১৩টি গ্রেনেড বিস্ফোরণের বীভৎসতায় মুহূর্তেই মানুষের রক্ত-মাংসের স্তূপে পরিণত হয় সমাবেশস্থল। বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ পরিণত হয় মৃত্যুপুরীতে। স্প্লিন্টারের আঘাতে মানুষের হাত-পাসহ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ছিন্নভিন্ন হয়ে চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে। চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকতে দেখা যায় রক্তাক্ত নিথর দেহ। লাশ আর রক্তে ভেসে যায় বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউর সামনের পিচ-ঢালা পথ। নিহত-আহতদের জুতা-স্যান্ডেল ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে পুরো এলাকা ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে যায়। ভেসে আসে আহত ও মৃত্যুপ্রায় মানুষের গগনবিদারী আর্তচিৎকার।
সেদিন রাজধানীর প্রতিটি হাসপাতালে আহতদের তিল ধারণের স্থান ছিল না। ভাগ্যগুণে নারকীয় গ্রেনেড হামলায় অলৌকিকভাবে প্রাণে বেঁচে গেলেও শেখ হাসিনার দুই কানের শ্রবণশক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঘাতকদের প্রধান লক্ষ্য শেখ হাসিনা বেঁচে গেছেন দেখে তার গাড়ি লক্ষ্য করে ঘাতকরা ১২ রাউন্ড গুলি করে। তবে টার্গেট করা গুলি ভেদ করতে পারেনি বঙ্গবন্ধু কন্যাকে বহনকারী বুলেটপ্রুফ গাড়ির কাঁচ। হামলার পরপরই শেখ হাসিনাকে কর্ডন করে গাড়িতে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় তার তৎকালীন বাসভবন সুধাসদনে।
ঘটনায় আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মী ছাড়াও আহত হয়েছিল বিভিন্ন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকরা।
এদিকে গ্রেনেড হামলার পর ভয়, শঙ্কা ও ত্রাস গ্রাস করে ফেলে গোটা রাজধানীকে। এই গণহত্যার উত্তেজনা ও শোক আছড়ে পড়ে দেশ-বিদেশে। হামলার পর আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা নিজে বাঁচতে ও অন্যদের বাঁচাতে যখন ব্যস্ত হয়ে পড়ে ঠিক তখনই পুলিশ বিক্ষোভ মিছিলের ওপর বেধড়ক লাঠি-টিয়ার শেল চার্জ করে। এতে নষ্ট হয় সেই রোমহর্ষক আলামত। পরবর্তীতে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও প্রত্যক্ষ মদতে ওই ঘটনা ধামাচাপা, ‘জজ মিয়া’ নাটক সাজিয়ে ভিন্ন খাতে প্রবাহিতসহ হেন কোনও কাজ নেই যা করেনি বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার।
পরে দীর্ঘ ১৪ বছর পর ২০১৮ সালে আদালত ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায় প্রদান করে। রায়ে ১৯ জনের মৃত্যুদণ্ড, ১৯ জনের যাবজ্জীবন এবং বাকী ১১ জনের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেয়া হয়। মামলাটি এখন উচ্চ আদালতে বিচারাধীন।
আওয়ামী লীগের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মাস্টার-মাইন্ড বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ পলাতক আসামিদের দেশে ফিরিয়ে এনে আদালতের রায় কার্যকর করতে সরকারের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
এতে আরও বলা হয়, বিএনপি-জামাত জোট সরকার রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সহযোগিতায় রাজনৈতিক সমাবেশে যে ধরনের নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালায়, তা পৃথিবীর ইতিহাসে আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। সেই ভয়াল দিনটি বাঙালি জাতি কোনও দিন ভুলবে না।
একুশ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় নিহতদের স্মরণে ২১ আগস্ট রবিবার সকাল ১০টায় বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউর আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের শহীদ বেদিতে শ্রদ্ধা নিবেদন এবং সোয়া দশটায় একই স্থানে আলোচনা সভা। আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সভায় সভাপতিত্ব করবেন।
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এক বিবৃতিতে নারকীয় গ্রেনেড হামলায় নিহতদের স্মরণে উপরোক্ত কর্মসূচিতে দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের নেতা, ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ আওয়ামী লীগ এবং সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীদের স্বাস্থ্যবিধি মেনে উপস্থিত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। একইসঙ্গে কেন্দ্রীয় কর্মসূচির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় নিহতদের স্মরণে সারাদেশে সন্ত্রাস এবং জঙ্গিবাদবিরোধী বিভিন্ন উপযোগী কর্মসূচি যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে পালন করার জন্য আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর সকল স্তরের নেতা-কর্মী, সমর্থকদের প্রতি অনুরোধ জানানো হয়েছে।