বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তরে দ্রুত পতন, বাড়ছে মরুকরণের আশঙ্কা
আরিফুল ইসলাম
সোমবার বেলা ১২:৪৭, ২ নভেম্বর, ২০২৬
উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বরেন্দ্র অঞ্চল ক্রমেই তীব্র পানি সংকটের মুখে পড়ছে। একসময় যে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভর করে এ অঞ্চলে কৃষির ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটেছিল, সেই পানির স্তর এখন দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে। অনেক এলাকায় গভীর নলকূপ থেকেও আগের মতো পানি পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও কোথাও পানির স্তর ভূপৃষ্ঠের ২০০ ফুটেরও বেশি নিচে নেমে যাওয়ার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে কৃষি ও মানুষের দৈনন্দিন জীবনে।
নিরাপদ খাবার পানি সংগ্রহ করতে অনেক গ্রামের মানুষকে কয়েক শ মিটার দূরে যেতে হচ্ছে। অন্যদিকে সেচের পানির অভাবে বিস্তীর্ণ কৃষিজমি অনাবাদি পড়ে থাকছে।
কয়েক দশকে বদলে গেছে পানির পরিস্থিতি
বরেন্দ্র অঞ্চলে স্বাভাবিকভাবেই বৃষ্টিপাত কম এবং অনিয়মিত। আশির দশকে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ) হাজার হাজার গভীর নলকূপ স্থাপন করে সেচের সুযোগ বাড়ায়। এতে আগে যেখানে কৃষিকাজ ছিল অনিশ্চিত, সেখানে বোরো ধান, গম, ভুট্টা ও বিভিন্ন সবজির চাষ বাড়তে থাকে।
তবে দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ায় পানির স্বাভাবিক পুনর্ভরণ ব্যাহত হচ্ছে। ফলে ধারাবাহিকভাবে নিচে নামছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর।
তথ্যে উঠে এসেছে পানির স্তর কমার চিত্র
পানিসম্পদ পরিকল্পনা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৫ থেকে ১৯৯০ সালের মধ্যে বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ছিল ভূপৃষ্ঠ থেকে ২৬ থেকে ৩০ ফুট নিচে। ১৯৯৪ সালে তা নেমে যায় ৩৫ ফুটে। ২০০৪ সালে ৫১ ফুট এবং ২০১৩ সালে ৬০ ফুটে পৌঁছায়। বর্তমানে অনেক এলাকায় পানির স্তর ৮০ থেকে ৯০ ফুটেরও নিচে নেমেছে। কোথাও কোথাও ১১৩ ফুটের বেশি গভীরেও পানি পাওয়া যাচ্ছে না।
অন্যদিকে ব্র্যাক, গ্লোবাল সেন্টার অন অ্যাডাপটেশন এবং ইন্টারন্যাশনাল ওয়াটার ম্যানেজমেন্ট ইনস্টিটিউটের যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, বরেন্দ্র অঞ্চলের ৮২ শতাংশের বেশি এলাকা পানি সংকটের আওতায় রয়েছে। গবেষণায় সতর্ক করা হয়েছে, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আগামী দুই দশকের মধ্যে এ অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানির মজুত সংকটজনক পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।
সংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা
পানি সংকটের অবনতি বিবেচনায় সরকার গত বছর রাজশাহী, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার ২৫ উপজেলার ৪৭টি ইউনিয়নের এক হাজার ৪৬৯টি মৌজাকে ‘অতি উচ্চ পানি সংকটাপন্ন’ এলাকা ঘোষণা করে। এ ছাড়া ৮৮৪টি মৌজাকে ‘উচ্চ পানি সংকটাপন্ন’ এবং এক হাজার ২৪০টি মৌজাকে ‘মধ্যম মাত্রার পানি সংকটাপন্ন’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
সরকারি হিসাবে, এসব এলাকার মোট আয়তন প্রায় দুই হাজার ৭৮৭ বর্গকিলোমিটার। সেখানে প্রায় ২১ লাখ ৫ হাজার মানুষ কোনো না কোনোভাবে পানি সংকটের প্রভাবের মধ্যে রয়েছে।
পানি আইন-২০১৩ অনুযায়ী, এসব এলাকায় খাবার পানির প্রয়োজন ছাড়া ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহারে সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়েছে। নতুন নলকূপ স্থাপনের ক্ষেত্রেও রয়েছে বিধিনিষেধ। তবে বাস্তবে অনেক এলাকায় এখনো ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন অব্যাহত রয়েছে।
পানির অভাবে ভোগান্তিতে গ্রামবাসী
কৃষির পাশাপাশি নিরাপদ খাবার পানির সংকটও প্রকট হচ্ছে। রাজশাহীর তানোর উপজেলার উচ্চাডাঙ্গা গ্রামে শত শত গভীর নলকূপ অকেজো হয়ে পড়েছে। উন্নয়ন সংস্থা ডাসকো ফাউন্ডেশন এক হাজার ৪০০ ফুট পর্যন্ত খনন করেও গ্রামের অনেক স্থানে পর্যাপ্ত পানির স্তর খুঁজে পায়নি।
সেচের খরচ বাড়ছে, কমছে কৃষকের লাভ
ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় সেচের ব্যয়ও বেড়েছে। রাজশাহীর কৃষক শব্দরানী জানান, আগে এক ঘণ্টা সেচ দিতে ৯০ টাকা খরচ হতো। এখন একই কাজের জন্য দিতে হচ্ছে ১২০ টাকা। পাশাপাশি সার ও শ্রমিকের খরচ বেড়েছে, কিন্তু উৎপাদন আগের তুলনায় কমেছে।
ব্যক্তিমালিকানাধীন নলকূপ নিয়ন্ত্রণে চ্যালেঞ্জ
সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী, বরেন্দ্র অঞ্চলে সর্বোচ্চ ১১ হাজার ৪০০টি গভীর নলকূপ পরিচালনার অনুমতি রয়েছে। তবে বাস্তবে ব্যক্তিমালিকানায় বিপুলসংখ্যক শ্যালো ও গভীর নলকূপ স্থাপন করা হয়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, তিন জেলায় বর্তমানে প্রায় ৬২ হাজার শ্যালো টিউবওয়েল এবং প্রায় চার হাজার গভীর নলকূপ রয়েছে। পানি উত্তোলনের সক্ষমতার হিসাবে এসব নলকূপ প্রায় ২৮ হাজার গভীর নলকূপের সমতুল্য।
বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ড. মো. আবুল কাসেম বলেন, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী এলাকায় সর্বোচ্চ ১১ হাজার ৪০০টি নলকূপ থাকার কথা। এর মধ্যে বিএমডিএ পরিচালনা করছে প্রায় আট হাজার ৪০০টি। কিন্তু ব্যক্তিমালিকানাধীন নলকূপের সংখ্যা প্রায় ২৮ হাজারে পৌঁছে গেছে, যা ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।
সংকট মোকাবিলায় বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাকের পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি কর্মসূচির প্রধান মোহাম্মদ আলী একুশে টেলিভিশনকে বলেন, শুধু নিরাপদ পানির সরবরাহ নিশ্চিত করলেই হবে না। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পানিসাশ্রয়ী সেচব্যবস্থা, জলবায়ু সহনশীল ফসল, টেকসই কৃষিপদ্ধতি এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণভিত্তিক পানি ব্যবস্থাপনায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেন, ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ নিশ্চিত করতে একটি প্রাথমিক কর্মপরিকল্পনা প্রস্তুত করা হয়েছিল। তাঁর মতে, বর্তমান সরকার সেটি বাস্তবায়ন করলে বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষি ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে।



