জাতিসংঘ সফরে ১১ দেশের সঙ্গে বৈঠক, ৩০ কর্মসূচিতে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী: মাহদী আমিন
আরিফুল ইসলাম
শনিবার সকাল ১১:৪৩, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্ক সফরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ১১টি দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকসহ মোট ৩০টি আনুষ্ঠানিক আন্তর্জাতিক কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন।
শুক্রবার নিউইয়র্ক সময় বিকেল ৫টায় (বাংলাদেশ সময় শনিবার ভোর ৩টা) জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনে আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে তিনি এসব তথ্য জানান। প্রধানমন্ত্রীর চার দিনের কর্মসূচি নিয়ে আয়োজিত ওই ব্রিফিংয়ে মাহদী আমিন সফরের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে ৩০টি আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি, ১১টি দ্বিপক্ষীয় বৈঠক এবং বিভিন্ন বহুপক্ষীয় ও উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।
মাহদী আমিন বলেন, সফরের চার দিনে প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত আটটি কর্মসূচিতে অংশ নেন। পাশাপাশি চারটি উচ্চপর্যায়ের পার্শ্ব বৈঠক, ১১টি দেশের নেতাদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বিশিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে বৈঠক করেন। এসব আলোচনায় বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, জনশক্তি রপ্তানি, জ্বালানি নিরাপত্তা, আঞ্চলিক সহযোগিতা, রোহিঙ্গা সংকট, স্বাস্থ্য, জলবায়ু পরিবর্তন ও বিশ্বশান্তির বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।
জাতিসংঘের কর্মসূচি ও বিভিন্ন বক্তব্য
মাহদী আমিনের তথ্য অনুযায়ী, সাধারণ পরিষদকেন্দ্রিক আটটি কর্মসূচির মধ্যে সাধারণ বিতর্কে বক্তব্য দেওয়া, জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের দেওয়া প্রাতরাশে অংশ নেওয়া এবং উদ্বোধনী অধিবেশনসহ বিভিন্ন আয়োজন ছিল।
এর পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ন্যায্য রূপান্তর এবং স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে উচ্চপর্যায়ের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে রোহিঙ্গা সংকট এবং ধাত্রী বা মিডওয়াইফারি ও মাতৃ-নবজাতক স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে দুটি উচ্চপর্যায়ের অনুষ্ঠান আয়োজন করে। এসব আয়োজনেও প্রধানমন্ত্রী বক্তব্য দেন। জলবায়ু ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা নিয়ে আয়োজিত অনুষ্ঠানেও তিনি বাংলাদেশের বিভিন্ন উদ্যোগ ও প্রস্তাব তুলে ধরেন।
মাহদী আমিন জানান, জলবায়ু বিষয়ক আলোচনায় বাংলাদেশ আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানো, ২০ হাজার কিলোমিটারের বেশি খাল খনন এবং পদ্মা ব্যারাজ ও তিস্তা মহাপরিকল্পনাসহ বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরেছে।
১১ দেশের নেতার সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক
প্রধানমন্ত্রীর দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের তালিকায় ছিল মালদ্বীপ, ভুটান, হাইতি, তুরস্ক, ক্রোয়েশিয়া, ইরান, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড, কুয়েত, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত।
এসব বৈঠকে পারস্পরিক সম্পর্ক, আঞ্চলিক সহযোগিতা, জনগণের মধ্যে যোগাযোগ, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ এবং বিভিন্ন খাতে অংশীদারত্ব নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে মাহদী আমিন জানান। পাকিস্তান ও থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গেও আঞ্চলিক সহযোগিতা ও জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
বিশেষ করে কুয়েত, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে বৈঠকে মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের স্বার্থ, জনশক্তি রপ্তানি, জ্বালানি ও খনিজ খাতে সহযোগিতা এবং বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। তিন দেশ থেকেই প্রধানমন্ত্রীকে আনুষ্ঠানিক সফরের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে বলে মাহদী আমিন জানান।
আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বৈঠক
দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের বাইরে প্রধানমন্ত্রী বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট, জাতিসংঘ মহাসচিব, জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার এবং মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন।
এ ছাড়া গেটস ফাউন্ডেশন, ইন্টারন্যাশনাল পিস ইনস্টিটিউট এবং ওয়াল স্ট্রিটের শীর্ষ বিনিয়োগকারীদের সঙ্গেও আলোচনা করেন তিনি।
সফরের শেষ দিনে জেপি মর্গান চেস আয়োজিত ‘ব্রেকফাস্ট মিটিং উইথ ওয়াল স্ট্রিট’ অনুষ্ঠানে প্রায় ২০টি শীর্ষ মার্কিন প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক হয়। সেখানে বিশেষ করে বাংলাদেশের আর্থিক খাতে মার্কিন বিনিয়োগ বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে মাহদী আমিন জানান।
এরপর ইন্টারন্যাশনাল পিস ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট এবং জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ফলকার টুর্কের সঙ্গেও বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী। এসব বৈঠকে মানবাধিকার, আইনের শাসন, গণতন্ত্র ও শান্তিসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
ডা. জুবাইদা রহমানের আট কর্মসূচি
প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমানও সফরে আটটি উচ্চপর্যায়ের আন্তর্জাতিক কর্মসূচিতে অংশ নেন এবং চারটিতে বক্তব্য দেন বলে মাহদী আমিন জানান।
এর মধ্যে জাতিসংঘের নারী নেত্রীদের প্ল্যাটফর্মের বার্ষিক অধিবেশন, ফার্স্ট স্পাউসেস ডায়ালগ এবং মিডওয়াইফারি ও মাতৃ-নবজাতক স্বাস্থ্যসেবা বিষয়ক উচ্চপর্যায়ের অনুষ্ঠান ছিল।
মাহদী আমিনের হিসাবে, প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর প্রতিনিধিদলের সদস্যরা মিলিয়ে চার দিনের সফরে প্রায় ৮০টি আন্তর্জাতিক কর্মসূচিতে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন।
জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে দেওয়া বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বিশ্বশান্তি, মানবাধিকার, গণতন্ত্র, আইনের শাসন, ফিলিস্তিন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নসহ বিভিন্ন বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেছেন বলে মাহদী আমিন জানান।
তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি ও পরিবেশ খাতে সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেছেন। এর মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, ই-হেলথ কার্ড এবং ভবিষ্যতে ইউনিভার্সাল কার্ড চালুর পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করা হয়।
মাহদী আমিন বলেন, সফরটি তুলনামূলক ছোট প্রতিনিধিদল নিয়ে পরিচালিত হয়েছে এবং সীমিত সময়ের মধ্যে প্রতিটি বৈঠকে বাংলাদেশের স্বার্থ তুলে ধরার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ সময় পর জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারের প্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন।
জাতিসংঘ সফর শেষে প্রধানমন্ত্রী দেশে ফেরার পথে রয়েছেন। সফরকালে তাঁর বিভিন্ন কর্মসূচিতে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব এ এম এম সালেহ শিবলী, অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমনসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তা ও প্রেস উইংয়ের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।



