বৃহস্পতিবার , ২৭শে ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ইং
৪০ বছর ধরে ১ টাকায় শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছেন যিনি

৪০ বছর ধরে ১ টাকায় শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছেন যিনি

তারেক আল মুরশিদ, গাইবান্ধা প্রতিনিধি:  প্রত্যন্ত গ্রামে বর্তমানে প্রাইভেট কিংবা কোচিংয়ে পড়তে হলে শিক্ষার্থীদের দিতে হয় পাঁচশ-এক হাজার টাকা। তবু শিক্ষকরা সন্তুষ্ট থাকেন না। কিন্তু সেখানে ছাত্র-ছাত্রীদের বাড়ি গিয়ে প্রাইভেট পড়ান ৭০ বছর বয়সী মো. লুৎফর রহমান। যার বিনিময়ে
তিনি নেন মাত্র এক টাকা। ফলে ‘এক টাকার মাস্টার’ হিসেবে তিনি পরিচিতি পান।

এক টাকা ফি নিয়ে শিক্ষার্থী পড়ানো এ মাস্টারের বাড়ি গাইবান্ধা সদর উপজেলার গিদারি ইউপির বাগুড়িয়া গ্রামে। প্রায় ৪০ বছর ধরে ওই গ্রামের নদী পাড়ের সুবিধাবঞ্চিত ছেলে-মেয়েদের পড়ান তিনি। তবে সংসার চালাতে না পেরে বর্তমানে তিনি প্রতি শিক্ষার্থীর কাছ থেকে তিন-পাঁচ টাকা করে নেন।

১৯৫০ সালের ৭ আগস্ট ফুলছড়ি উপজেলার উড়িয়া গ্রামের এক ধনাঢ্য পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন লুত্ফর রহমান। তার বাবার নাম ফইমুদ্দিন ব্যাপারী। পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে তিনি সবার ছোট। সেই সময় প্রায় শত বিঘা জমি, পুকুর ভর্তি মাছ ও গোয়াল ভরা গরু ছিল। ১৯৭২ সালে ফুলছড়ি উপজেলার গুনভরী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন তিনি। ম্যাট্রিক পাসের পর একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। তখন শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়মুখী না হওয়ায় তিনি বাড়ি থেকে ডেকে আনতেন। এছাড়া বিদ্যালয় ছুটির পর বিনা পয়সায় প্রাইভেট পড়াতেন তিনি।

১৯৭৪ সালে ব্রহ্মপুত্র নদীর ভাঙনে তার বাবা সর্বস্বান্ত হলে তিনি পরিবারসহ গাইবান্ধার সদর উপজেলার গিদারি ইউপির ডাকাতিয়া গ্রামে আশ্রয় নেন। এ গ্রামে এসেও তার প্রাইভেট পড়ানো চালিয়ে যান। আর এখানেই শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বিনিময়ে এক টাকা নেয়া শুরু করেন তিনি।
কিন্তু এখানেও ঠাঁই হয়নি তার। ১৯৮৭ সালে এ বাড়িও নদীভাঙনের কবলে পড়লে আশ্রয় নেন একই ইউপির বাগুড়িয়া গ্রামের ওয়াপদা বাঁধে। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত বাগুড়িয়া, কিশামত ফলিয়া, ফুলছড়ি উপজেলার মদনের পাড়া, চন্দিয়া ও পৌরশহরের পূর্বপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় মাইলের পর মাইল হেঁটে ও বাইসাইকেলে শিক্ষার্থীদের বাড়ি যান লুৎফর রহমান। বর্তমানে প্রাথমিক
ও উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রায় ৩৫ জন ছাত্র-ছাত্রী তার কাছে পড়েন।

বাগুড়িয়া গ্রামের কাঠমিস্ত্রী মজিদ মিয়া ও মাছ ব্যবসায়ী ডাবারু বর্মণ বলেন, মাসে ৫০০-১০০০ টাকা খরচ করে ছেলে-মেয়েদের প্রাইভেট বা কোচিংয়ে পড়ানোর সামর্থ্য নেই। তাই লুৎফর রহমানের কাছে এক টাকা দিয়ে পড়াচ্ছি।
এতে অনেক উপকার হচ্ছে।

কেন এক টাকা নিয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের পড়ানো শুরু করেছিলেন জানতে চাইলে লুৎফর রহমান বলেন, নদীভাঙনে নিঃস্ব হওয়া গরিব এলাকা এটি। ছেলে-মেয়েদের পড়াতেই চাইতেন না বাবা-মায়েরা। তাই এক টাকার বিনিময়ে পড়ানো শুরু করি। দিনমজুর, রিকশা-ভ্যানচালকের ছেলে-মেয়েরা তো মানুষ হবে। আমার কাছে পড়ে অনেকেই ভালো চাকরি করছে।
এটাই আমার সার্থকতা। তার পরিবারে রয়েছেন স্ত্রী লতিফুল বেগম, দুই ছেলে লাভলু মিয়া, লিটন মিয়া ও দুই মেয়ে লিম্মি, লিপি। দুই মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। আর লাভলু এসএসসি পাসের পর অর্থাভাবে পড়াশোনা করতে পারেননি। তিনি এখন অটোরিকশা চালান। লিটন একটি মাদরাসায়
শিক্ষকতা করেন।
লুত্ফর মাস্টারের স্ত্রী লতিফুল বেগম জানান, এভাবেই প্রায় ৪০ বছর ধরে এক টাকার বিনিময়ে গ্রামে গ্রামে শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট পড়াচ্ছেন তার স্বামী। অভিভাবকদের বুঝিয়ে গাছতলা, বাঁশতলা ও বাড়ির উঠান যেখানেই সুযোগ পান সেখানেই বাচ্চাদের পড়ান তিনি।তিনি আরো জানান, এলাকায় সুবিধাবঞ্চিত ছেলে-মেয়েদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেয়ায় ২০১৮ সালে তার স্বামীকে একটি বাইসাইকেল কিনে দেয় জেলা পরিষদ।

বন্ধুদের সাথে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




এক ক্লিকে জেনে নিন বিভাগীয় খবর

©মেঘনা নিউজ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Developed by Ateam IT Solution