ঢাকা () ,
শুভেচ্ছা বার্তা :
মেঘনা নিউজ-এর এক যুগে পদার্পণ উপলক্ষ্যে সকল পাঠক-দর্শক, প্রতিনিধি, শুভাকাঙ্ক্ষী, সহযোগী, কলাকৌশলীসহ দেশ ও প্রবাসের সবাইকে জানাই আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা।
শিরোনাম

“বুক পকেটে মৃত্যু, হৃদয়ে ভালোবাসা” – কবি হোসাইন মোহাম্মদ দিদারের “কাব্যভুবন”

স্টাফ রিপোর্টার স্টাফ রিপোর্টার Clock বুধবার রাত ০১:৫১, ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

বুক পকেটে মৃত্যু, হৃদয়ে ভালোবাসা

কবি হোসাইন মোহাম্মদ দিদারের কাব্যভুবন

 

কবিতার শুরু কোথায়—প্রেমে, বেদনায়, নাকি জীবনের কোনো গভীর উপলব্ধিতে? এ প্রশ্নের একক কোনো উত্তর নেই। কোনো কবির কবিতা জন্ম নেয় ভালোবাসার কাছে, কোনো কবির প্রতিবাদের ভেতর, আবার কেউ কেউ মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে জীবনের অর্থ খুঁজতে খুঁজতে কবিতার কাছে ফিরে আসেন।

হোসাইন মোহাম্মদ দিদারের কাব্যযাত্রাকে পাঠ করতে গেলে এই তিনটি শব্দ বারবার ফিরে আসে—ভালোবাসা, বেদনা ও মৃত্যু। তবে এগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় নয়; বরং তাঁর কবিতায় একটির ভেতর দিয়ে অন্যটির জন্ম হয়েছে।

২০১৪ সালে সর্বাঙ্গে তোমার বিচরণ এবং কাছে থেকো হৃদয়ের প্রকাশের মধ্য দিয়ে তাঁর কাব্যযাত্রার যে সূচনা, তা নিছক প্রেমের কবিতায় থেমে থাকেনি। ২০১৬ সালে তোমার বেদনার পাশে আমার ভালোবাসা প্রকাশের পর প্রেমের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সহমর্মিতা। ২০২২ সালের নন্দিত প্রেমের নিন্দিত লগন, ২০২৩ সালের অন্যরকম মেঘ, ২০২৪ সালের সে ফিরবে না আর এবং ২০২৫ সালের বুক পকেটে মৃত্যু নিয়ে ঘুরি—এই ধারাবাহিকতায় তাঁর কবিতার বিষয় ও অনুভূতির পরিসর ক্রমশ বিস্তৃত হয়েছে।

আর ২০২৭ সালে আসছে তাঁর অষ্টম কাব্যগ্রন্থ—বলতে এলাম ভালোবাসি।

এই নামটিই যেন তাঁর দীর্ঘ কাব্যযাত্রার দিকে ফিরে তাকানোর একটি নতুন দরজা খুলে দেয়।

 

প্রেম দিয়ে শুরু, কিন্তু প্রেমেই শেষ নয়

দিদারের কবিতার প্রথম পরিচয় প্রেমের সঙ্গে।

সর্বাঙ্গে তোমার বিচরণ—নামটির মধ্যেই প্রিয় মানুষের সর্বব্যাপী উপস্থিতির অনুভব রয়েছে। কাছে থেকো হৃদয়ের—এখানে আকাঙ্ক্ষা আরও ব্যক্তিগত, আরও অন্তরঙ্গ।

কিন্তু তাঁর প্রেম কেবল প্রাপ্তির আনন্দে আটকে থাকে না। প্রেমের সঙ্গে তাঁর কবিতায় খুব দ্রুত এসে যায় অপেক্ষা, অনুপস্থিতি, বেদনা এবং হারানোর আশঙ্কা।

২০১৬ সালের কাব্যগ্রন্থ তোমার বেদনার পাশে আমার ভালোবাসা এই জায়গায় বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

শিরোনামটির দিকে তাকালেই বোঝা যায়—এখানে ভালোবাসা শুধু কাছে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা নয়; ভালোবাসা মানে অন্যের বেদনার পাশে দাঁড়ানো।

এই জায়গাতেই দিদারের প্রেম ব্যক্তিগত আবেগের সীমানা ছাড়িয়ে মানবিকতার দিকে যাত্রা শুরু করে।

 

ভালোবাসার আরেক নাম সহমর্মিতা

কবিতায় প্রেম বহুদিন ধরেই একটি চিরন্তন বিষয়। কিন্তু প্রেমকে কীভাবে দেখা হচ্ছে, সেটিই একজন কবিকে আলাদা করে।

দিদারের কবিতায় ভালোবাসা শুধু সৌন্দর্যের উপাসনা নয়। ভালোবাসার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মানুষের কষ্টের প্রতি সংবেদনশীলতা।

এই কারণে তাঁর কবিতার ‘তুমি’কে কেবল একজন প্রেমিক বা প্রেমিকা হিসেবে পড়লে অনেক কিছুই বাদ পড়ে যায়।

কখনো ‘তুমি’ প্রিয়জন, কখনো মানুষ, কখনো বৃহত্তর মানবসমাজ, আবার কখনো সেই অদৃশ্য পরম সত্তা—যার দিকে মানুষের সমস্ত আকাঙ্ক্ষা শেষ পর্যন্ত ফিরে যেতে চায়।

তাঁর কাব্যভুবনে তাই প্রেমের একটি বিস্তৃত রূপ দেখা যায়—

প্রিয়জনকে ভালোবাসা থেকে মানুষকে ভালোবাসা, আর মানুষকে ভালোবাসা থেকে পরমকে ভালোবাসার দিকে যাত্রা।

 

প্রেম যখন প্রতিবাদের ভাষা

মানুষকে ভালোবাসলে মানুষের ওপর অন্যায় মেনে নেওয়া কঠিন।

দিদারের কবিতায় এখানেই প্রেমের সঙ্গে দ্রোহের সম্পর্ক তৈরি হয়।

তাঁর প্রতিবাদ কোনো শূন্য স্লোগান নয়; এর পেছনে আছে মানুষের প্রতি দায়বোধ। যে মানুষ অন্যায়ের শিকার, যে মানুষ বঞ্চিত, যে মানুষ ভয় নিয়ে বেঁচে থাকে—তার পাশে দাঁড়ানোর আকাঙ্ক্ষা থেকেই কবির কণ্ঠে প্রতিবাদের জন্ম।

এই অর্থে তাঁর দ্রোহকে প্রেমের বিপরীত বলা যায় না।

বরং বলা যায়—

মানবপ্রেমেরই আরেক নাম প্রতিবাদ।

যেখানে অন্যায় আছে, সেখানে নীরবতা কখনো কখনো অন্যায়ের পক্ষ নেওয়ার সমান। কবি সেই নীরবতা ভাঙতে চান।

 

সমকাল তাঁর কবিতার বাইরে নয়

দিদারের কবিতা শুধু ব্যক্তিগত অনুভূতির ভেতর বাস করে না। তাঁর কবিতায় সময়ও প্রবেশ করেছে।

সমাজের অস্থিরতা, মানুষের নিরাপত্তাহীনতা, রাজনৈতিক বাস্তবতা, সাধারণ মানুষের দীর্ঘশ্বাস—এসব তাঁর কাব্যচিন্তার অংশ।

‘দীর্ঘশ্বাসের দীর্ঘ লাইন’—শিরোনামটিই তার একটি চমৎকার উদাহরণ।

‘লাইন’ সাধারণত অপেক্ষার দৃশ্য তৈরি করে। কিন্তু ‘দীর্ঘশ্বাসের লাইন’ তৈরি করলে সেই অপেক্ষা ব্যক্তিগত থাকে না; তা হয়ে ওঠে মানুষের সম্মিলিত বেদনার প্রতীক।

একজন কবি যখন ব্যক্তিগত দীর্ঘশ্বাসকে সামাজিক দীর্ঘশ্বাসে পরিণত করতে পারেন, তখন তাঁর কবিতা ব্যক্তিজীবনের গণ্ডি অতিক্রম করে সময়ের ভাষা হয়ে ওঠে।

 

ভয় পাওয়া কবিও প্রতিবাদ করেন

দিদারের কবিতায় আরেকটি মানবিক দিক লক্ষণীয়—তিনি নিজেকে ভয়হীন কোনো পৌরাণিক নায়ক হিসেবে নির্মাণ করেন না।

‘আমার এখন খুব ভয় করে’—এই স্বীকারোক্তির ভেতর দিয়ে একজন সাধারণ মানুষের অস্তিত্ব সামনে আসে।

প্রতিবাদী মানুষও ভয় পায়।

কবি ভয় পান।

কিন্তু ভয় থাকা সত্ত্বেও তিনি প্রশ্ন করেন।

এখানেই কবিতাটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

কারণ সাহস মানে ভয় না পাওয়া নয়; ভয়কে সঙ্গে নিয়েও সত্যের দিকে তাকানো।

 

‘সে ফিরবে না আর’: অনুপস্থিতির কবিতা

প্রেমের কবিতায় উপস্থিতির চেয়ে অনুপস্থিতি অনেক সময় বেশি শক্তিশালী।

সে ফিরবে না আর—শিরোনামটিই একটি অসমাপ্ত অপেক্ষার দরজা খুলে দেয়।

এখানে ফিরে আসার সম্ভাবনা নেই।

অতএব অপেক্ষা আর আনন্দের নয়; অপেক্ষা পরিণত হয়েছে স্মৃতিতে।

প্রিয় মানুষ যখন পাশে থাকে, তখন ভালোবাসা বর্তমান।

যখন দূরে যায়, ভালোবাসা অপেক্ষা।

আর যখন আর ফিরে আসে না, ভালোবাসা হয়ে ওঠে স্মৃতি।

দিদারের কাব্যভুবনে এই অনুপস্থিতি প্রেমকে আরও গভীর বেদনার দিকে নিয়ে যায়।

 

বুক পকেটে মৃত্যু

২০২৫ সালে প্রকাশিত বুক পকেটে মৃত্যু নিয়ে ঘুরি তাঁর কাব্যযাত্রার একটি তাৎপর্যপূর্ণ পর্যায়।

কাব্যগ্রন্থটির নামেই আছে এক অসাধারণ বৈপরীত্য—

বুক পকেট খুব ব্যক্তিগত, খুব কাছের।

আর মৃত্যু জীবনের সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা।

কবি সেই মৃত্যুকেই বুক পকেটে বহন করছেন।

অর্থাৎ মৃত্যু তাঁর কাছে দূরের কোনো ঘটনা নয়; জীবনের নিত্যসঙ্গী।

মানুষ প্রতিদিন বেঁচে থাকে, অথচ প্রতিদিনই মৃত্যুর সম্ভাবনাকে সঙ্গে নিয়ে চলে।

এই উপলব্ধি কবিতাকে প্রেমের কোমলতা থেকে অস্তিত্বের কঠিন প্রশ্নের দিকে নিয়ে যায়।

 

মৃত্যুকে দেখে জীবনের দিকে ফেরা

দিদারের কবিতায় মৃত্যু শেষ কথা নয়।

মৃত্যুচেতনা বরং জীবনকে নতুনভাবে দেখার একটি সুযোগ।

‘আমি মারা গেলে’ ধরনের কবিতায় মৃত্যুর পরে প্রিয় মানুষের জীবন, স্মৃতি ও বিস্মৃতির প্রশ্ন সামনে আসে।

এখানে মৃত্যু মানে কেবল শরীরের অনুপস্থিতি নয়; বরং মানুষ চলে যাওয়ার পর তার ভালোবাসা কতদিন থাকে—সেই প্রশ্নও।

একজন মানুষ কি মৃত্যুর পরও অন্যের স্মৃতিতে বেঁচে থাকে?

একটি ভালোবাসা কি মৃত্যুর সঙ্গে শেষ হয়ে যায়?

নাকি ভালোবাসাই মৃত্যুকে অতিক্রম করার মানুষের সবচেয়ে বড় ক্ষমতা?

দিদারের কবিতার ভেতরে এই প্রশ্নগুলো বারবার ফিরে আসে।

 

সুফি ভাবনা ও পরমের সন্ধান

দিদারের কাব্যচর্চার আরেকটি দিক হলো আত্মিকতা।

মানুষের প্রতি ভালোবাসা, স্রষ্টার প্রতি ভালোবাসা, নবীপ্রেম এবং সুফিবাদী ভাবনার উপস্থিতি তাঁর পরবর্তী কবিতায় বিশেষভাবে লক্ষণীয়।

এই প্রবণতাকে তাঁর প্রেমের কবিতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখলে কাব্যবিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হারিয়ে যায়।

কারণ প্রেম তাঁর কাছে ক্রমশ বিস্তৃত হয়েছে।

প্রথমে প্রেম ছিল একজনকে ঘিরে।

তারপর মানুষকে ঘিরে।

শেষ পর্যন্ত তা পরমের দিকে তাকানোর একটি মাধ্যম হয়ে উঠেছে।

এখানে কবিতার ‘আমি’ কেবল প্রেমিক নয়; সে একজন অনুসন্ধানী মানুষ।

সে জানতে চায়—জীবনের অর্থ কী, মৃত্যুর পরে কী, মানুষ কোথা থেকে আসে এবং শেষ পর্যন্ত কোথায় ফিরে যায়।

 

দিদারের কবিতায় ‘আমি’ ও ‘তুমি’

তাঁর কাব্যভুবনে ‘আমি’ ও ‘তুমি’ দুটি গুরুত্বপূর্ণ শব্দ।

‘আমি’—প্রেমিক, অপেক্ষমাণ, বেদনাহত, প্রতিবাদী, ভীত এবং মৃত্যুচিন্তায় আক্রান্ত একজন মানুষ।

‘তুমি’—কখনো প্রিয়তমা, কখনো মানুষ, কখনো সমাজ, কখনো পরম।

এই ‘তুমি’র অর্থ যত বিস্তৃত হয়েছে, তাঁর কবিতার জগতও তত বিস্তৃত হয়েছে।

প্রেমের কবিতা থেকে মানবতার কবিতা, মানবতার কবিতা থেকে আত্মিকতার কবিতা—এই যাত্রার কেন্দ্রেই রয়েছে ‘আমি’ ও ‘তুমি’র সম্পর্ক।

 

ভাষা: সহজ কথায় গভীর অনুভব

দিদারের কবিতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য তাঁর সহজ ভাষা।

তিনি জটিল শব্দের আড়ালে অনুভূতিকে লুকিয়ে রাখেন না। পরিচিত শব্দ, দৈনন্দিন জীবন এবং সহজ বাক্যের মধ্য দিয়েই অনুভূতি প্রকাশ করেন।

এই সরলতা তাঁকে পাঠকের কাছে সহজে পৌঁছে দেয়।

তবে সরলতা কখনো সরল অর্থের সমার্থক নয়।

একটি সহজ বাক্যও গভীর অনুভূতি বহন করতে পারে—যদি তার পেছনে থাকে অভিজ্ঞতা।

দিদারের কবিতায় সেই অভিজ্ঞতা এসেছে প্রেম, বিচ্ছেদ, সমাজ, ভয়, মৃত্যু এবং বিশ্বাসের নানা স্তর থেকে।

 

মেঘ, গোলাপ, নদী আর দীর্ঘশ্বাস

দিদারের কবিতায় প্রকৃতি ও দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন উপাদান প্রতীকে পরিণত হয়।

গোলাপ হয়ে ওঠে প্রেমের প্রতীক।

নদী হয়ে ওঠে প্রবাহের।

মেঘ কখনো বিষণ্ণতার।

জোছনা কোমলতার।

দীর্ঘশ্বাস সামাজিক বেদনার।

আর বুক পকেট হয়ে ওঠে ব্যক্তিমানুষের অস্তিত্বের প্রতীক।

এই প্রতীকগুলো তাঁর কবিতাকে দৃশ্যমান করে।

অনুভূতিকে তিনি শুধু বলেন না; অনেক সময় একটি দৃশ্যের মধ্যে রেখে দেন।

 

প্রত্নতাত্ত্বিক হৃদয়

‘প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন’ নামটিও তাঁর প্রেমভাবনার একটি আকর্ষণীয় দিক প্রকাশ করে।

প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন মানে এমন কিছু, যা সময়ের গভীরতা পেরিয়ে টিকে থাকে।

স্মৃতিও তেমন।

মানুষ চলে যায়, সম্পর্ক বদলে যায়, সময় পেরিয়ে যায়—কিন্তু কিছু অনুভূতি হৃদয়ের গভীরে থেকে যায়।

এই জায়গায় প্রেম আর বর্তমানের ঘটনা থাকে না।

তা হয়ে ওঠে স্মৃতির নিদর্শন।

এখানেই দিদারের প্রেমের কবিতা সময়ের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে।

 

সাত থেকে আট: কাব্যযাত্রার নতুন বাঁক

২০১৪ থেকে ২০২৫—এক দশকেরও বেশি সময়ে সাতটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের পর ২০২৭ সালে আসছে অষ্টম কাব্যগ্রন্থ—

‘বলতে এলাম ভালোবাসি’।

এই নামটি বিশেষভাবে লক্ষ করার মতো।

কারণ এর আগে এসেছে—

সর্বাঙ্গে তোমার বিচরণ,

কাছে থেকো হৃদয়ের,

তোমার বেদনার পাশে আমার ভালোবাসা,

সে ফিরবে না আর,

এবং

বুক পকেটে মৃত্যু নিয়ে ঘুরি।

এই নামগুলোর ধারাবাহিকতা যেন একটি দীর্ঘ গল্প বলে।

প্রথমে ভালোবাসার কাছে যাওয়া।

তারপর ভালোবাসার বেদনা।

তারপর বিচ্ছেদ।

তারপর মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়া।

আর তারপর আবার—

‘বলতে এলাম ভালোবাসি’।

এখানে একটি কাব্যিক বৃত্ত তৈরি হয়।

ভালোবাসা → বেদনা → বিচ্ছেদ → মৃত্যু → আবার ভালোবাসা।

অবশ্য বলতে এলাম ভালোবাসি এখনও প্রকাশিত হয়নি। তাই গ্রন্থটির কবিতাগুলো না পড়ে এর বিষয়বস্তু সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া সমীচীন হবে না। তবে শিরোনামটি তাঁর পূর্ববর্তী কাব্যযাত্রার সঙ্গে একটি তাৎপর্যপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করেছে—এ কথা বলা যায়।

 

কবির সবচেয়ে বড় বিষয়: মানুষ

দিদারের কবিতার বিষয় অনেক।

প্রেম আছে।

বিরহ আছে।

বেদনা আছে।

দ্রোহ আছে।

মৃত্যু আছে।

ধর্মীয় অনুভূতি আছে।

প্রকৃতি আছে।

কিন্তু এসবের কেন্দ্রে শেষ পর্যন্ত যে সত্তাটি থাকে, সে হলো মানুষ।

প্রেমিক মানুষ।

বেদনাহত মানুষ।

নিপীড়িত মানুষ।

ভীত মানুষ।

মৃত্যুর মুখোমুখি মানুষ।

এবং পরমের সন্ধানী মানুষ।

তাই তাঁর কবিতাকে কেবল প্রেমের কবিতা বলা যেমন অসম্পূর্ণ, তেমনি কেবল দ্রোহের কবিতা বলাও যথেষ্ট নয়।

বরং তাঁর কবিতার ভেতরে প্রেম, মানবতা, প্রতিবাদ ও আত্মিকতার একটি আন্তঃসম্পর্ক তৈরি হয়েছে।

 

একজন কবির পথচলা

কোনো কবির সাহিত্যিক অবস্থান একদিনে নির্ধারিত হয় না।

সময়ই শেষ পর্যন্ত বিচারক।

পাঠক, সমালোচক ও গবেষকই নির্ধারণ করেন কোনো কবির কোন রচনা সময় অতিক্রম করে টিকে থাকবে।

হোসাইন মোহাম্মদ দিদারের কাব্যযাত্রাও এখনও চলমান।

২০১৪ সালে যে যাত্রা প্রেম দিয়ে শুরু হয়েছিল, তা ২০২৫ সালে মৃত্যুচেতনার গভীরে পৌঁছেছে।

২০২৭ সালে সেই কবিই আবার বলছেন—

‘বলতে এলাম ভালোবাসি’।

এই ফিরে আসা নিছক শব্দের ফিরে আসা নয়।

এটি একটি কাব্যিক প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা।

মৃত্যুকে দেখেও ভালোবাসার কথা বলা।

বেদনা পেয়েও ভালোবাসার কথা বলা।

বিচ্ছেদ জেনেও ভালোবাসার কথা বলা।

সম্ভবত এখানেই কবিতার সবচেয়ে বড় শক্তি।

কারণ মানুষ শেষ পর্যন্ত বেঁচে থাকে কী দিয়ে?

শুধু রক্ত-মাংস দিয়ে নয়।

স্মৃতি দিয়ে।

স্বপ্ন দিয়ে।

আর ভালোবাসা দিয়ে।

হোসাইন মোহাম্মদ দিদারের কবিতার দীর্ঘ যাত্রাকে তাই একটি বাক্যে ধরতে হলে বলা যায়—

তিনি বুক পকেটে মৃত্যু নিয়ে হাঁটেন, কিন্তু হৃদয় থেকে ভালোবাসাকে ফেলে দেন না।

আর সেই কারণেই তাঁর অষ্টম কাব্যগ্রন্থের সম্ভাব্য উচ্চারণটি এত তাৎপর্যপূর্ণ—

‘বলতে এলাম ভালোবাসি’।

এ যেন মৃত্যুকে অস্বীকার নয়, বরং মৃত্যুকে জেনেও জীবনের পক্ষে দাঁড়ানো।

এ যেন বেদনাকে ভুলে যাওয়া নয়, বরং বেদনার পাশেই ভালোবাসার হাত রেখে দেওয়া।

এ যেন কবির দীর্ঘ যাত্রার একটি নতুন অধ্যায়—

আবার ভালোবাসার কাছে ফেরা।

 

~ মামুনুর রশীদ




শেয়ার করুন


মেঘনা নিউজ-এ যোগ দিন

Meghna Roktoseba

Emergency Relief Fund - As-Sunnah Foundation




এক ক্লিকে জেনে নিন বিভাগীয় খবর



© মেঘনা নিউজ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Developed by ShasTech-IT