একটি গল্প : আমরা মুসাফির – ফাতেহা সুরভী
মেঘনা নিউজ ডেস্ক
মঙ্গলবার রাত ০৯:২৭, ১৮ আগস্ট, ২০২৬
রাত প্রায় বারোটা ছুঁই ছুঁই।
ঘোর অমাবস্যা। আকাশে চাঁদের কোনো চিহ্ন নেই। চারপাশ এমন কালো হয়ে আছে, মনে হচ্ছে রাতটা যেন গোটা গ্রামটাকে গিলে খেয়েছে।
মাজেদ গঞ্জের পাঠ চুকিয়ে বাড়ির উদ্দেশে রওনা দিয়েছে। গঞ্জ থেকে তার বাড়ি প্রায় তিন কিলোমিটার পথ।
পথে হাঁটতে হাঁটতে পকেট থেকে একটা বিড়ির শলাকা বের করে ঠোঁটে চেপে ধরল সে। লুঙ্গির খুঁট থেকে ম্যাচ বের করে বিড়িতে আগুন ধরিয়ে একটা লম্বা সুখটান দিল।
তারপর আপনমনে গুনগুন করে গান ধরল
“আমায় এত রাইতে কেন ডাক দিলি, প্রাণ কোকিলা রে”
নিজের গলার আওয়াজেই যেন নিজের সাহসটা একটু বেড়ে গেল।
কিছুদূর যাওয়ার পর বড় রাস্তাটা দুই ভাগ হয়ে গেছে। এক রাস্তা ঘুরে গ্রামের দিকে গেছে
মেইন রোড। সে পথে গেলে আরও দুই কিলোমিটার বেশি হাঁটতে হবে।
আর অন্য রাস্তাটা একটা শর্টকাট।
এই পথটা দিয়ে গেলে প্রায় দুই কিলোমিটার পথ বেঁচে যায়।
তবে সেই শর্টকাটের মাঝখানেই পড়ে একটা পুরোনো জঙ্গল আর তার ভেতরকার কবরস্থান।
দিনের বেলায় জায়গাটা তেমন ভয়ংকর মনে হয় না। কিন্তু রাতের অন্ধকারে এই পথ দিয়ে যেতে গ্রামের মানুষও সাধারণত সাহস করে না।
মাজেদ অবশ্য এর আগে কয়েকবার এই পথ দিয়ে গেছে।
কিন্তু এত রাতে কখনো নয়।
কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে সে মেইন রোডের দিকে তাকাল। তারপর মনে মনে বলল,
আরে ধুর! মানুষ মরনের ভয়ে বাঁচে না। দুই কিলোমিটার বেশি হাঁটতে হইব, তার চাইতে এই পথই ভালো।
বুকের মধ্যে একরাশ সাহস জড়ো করে শর্টকাটের পথে পা বাড়াল।
শুরুতে রাস্তার দুই পাশে গাছপালা কম ছিল। কিন্তু একটু এগোতেই চারপাশের দৃশ্য বদলে গেল।
বুনোগুল্ম, কাঁটাঝোপ আর লতাপাতা মিলে পথটাকে প্রায় ঢেকে ফেলেছে। কোথাও কোথাও ঘাস কোমর পর্যন্ত উঠে এসেছে।
দূর থেকে থেমে থেমে পেঁচার ডাক ভেসে আসছে।
কখনো শেয়ালের হুক্কাহুয়া।
আকাশে এরই মধ্যে কালো মেঘ জমেছে। অমাবস্যার রাতের কালো আকাশ আর মেঘ যেন একাকার হয়ে গেছে।
হঠাৎ গুড়িগুড়ি বৃষ্টি শুরু হলো।
তারপর বাতাস।
ঝোড়ো বাতাসের ধাক্কায় রাস্তার দুই পাশের গাছগুলো এমনভাবে দুলতে লাগল, মনে হলো কোনো অদৃশ্য হাত তাদের শিকড় থেকে টেনে তুলতে চাইছে।
বৃষ্টির কয়েক ফোঁটা মাজেদের মুখে এসে পড়ল।
সে বিড়িতে আরেকটা টান দেওয়ার চেষ্টা করল।
কিন্তু
ফুসসস!
বিড়ির আগুন নিভে গেল।
—“হায় আল্লাহ!”
অন্ধকারে দেশলাই জ্বালাতে গিয়েও দুবার কাঠি ভেঙে গেল।
তৃতীয়বার আগুন ধরল ঠিকই, কিন্তু বাতাসের ঝাপটায় সেই আলোটুকুও মুহূর্তেই নিভে গেল।
এবার মাজেদের বুকের ভেতরটা কেমন যেন ধক করে উঠল।
সে টর্চটা জ্বালাল।
টর্চের দুর্বল আলোয় সামনের পথটা দেখা যাচ্ছে, আবার যাচ্ছে না।
কখনো মনে হচ্ছে সামনে কেউ দাঁড়িয়ে আছে।
আবার কাছে যেতেই দেখা যাচ্ছে ওটা একটা বাঁকা গাছ।
মাজেদ দ্রুত হাঁটতে শুরু করল।
কিন্তু অন্ধকারে বারবার তার পা গর্তে পড়ছে। কখনো ঝোপে আটকে যাচ্ছে লুঙ্গি।
এর মধ্যেই কবরস্থানটা সামনে এসে পড়ল।
কবরস্থানের ভেতর থেকে হঠাৎ শেয়ালের ডাক ভেসে এল।
তারপর আরেকটা।
তারপর একসঙ্গে কয়েকটা।
মাজেদের পায়ের গতি বেড়ে গেল।
ঠিক তখনই
ঠক… ঠক… ঠক…
পেছন থেকে একটা শব্দ।
মনে হলো ঘোড়ার খুরের শব্দ।
মাজেদ থেমে গেল।
শব্দও থেমে গেল।
সে আবার হাঁটল।
ঠক… ঠক… ঠক…
এবার শব্দটাও তার সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে আসছে।
মাজেদের শরীরের লোম দাঁড়িয়ে গেল।
পেছনে তাকানোর জন্য ঘাড়টা একটু ঘোরাতে গিয়েও থেমে গেল সে।
দাদী ছোটবেলায় বলত
“রাইতের বেলা পেছন থেইকা অদ্ভুত কোনো শব্দ আইলে পেছনে তাকাইস না। যা আছে, থাকতে দে।”
মাজেদ তাই চোখ শক্ত করে সামনের দিকে রাখল।
মনে মনে আয়াতুল কুরসি পড়তে শুরু করল।
হঠাৎ তার ডান পাশের ঝোপ নড়ে উঠল।
মাজেদ টর্চ ঘুরিয়ে ধরতেই
একগাদা সাদা বিড়াল রাস্তা পার হয়ে গেল।
একটা, দুইটা, তিনটা!
গুনতে গিয়ে মাজেদের হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল।
প্রায় আট-দশটা বিড়াল। সবগুলোর চোখ অন্ধকারে অস্বাভাবিকভাবে জ্বলছে।
আর তারা সাধারণ বিড়ালের মতো ডাকছে না।
শব্দটা অনেকটা ঘোড়ার হ্রেষাধ্বনির মতো।
মাজেদের বুকের ভেতর থেকে যেন কলিজাটা শুকিয়ে গেল।
সে চোখ নামিয়ে ফেলল।
আরও জোরে আয়াতুল কুরসি পড়তে লাগল।
কিছুক্ষণ পর আবার চোখ তুলে তাকাতেই দেখল
বিড়ালগুলো আর বিড়াল নেই।
কালো কুকুরের মতো কয়েকটা অবয়ব রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
তারপর হঠাৎ সবগুলো একসঙ্গে জঙ্গলের দিকে দৌড়ে অদৃশ্য হয়ে গেল।
মাজেদ আর থামল না।
তার ঠোঁট তখনও নড়ছে।
ঠিক তখনই
খুক… খুক
পেছন থেকে কেউ কেশে উঠল।
মাজেদের বুকের ভেতরটা যেন বন্ধ হয়ে গেল।
একটা কাঁপা গলায় সে বলল
—“কে যায়?”
পেছন থেকে শান্ত গলা ভেসে এল
—আমি।
—কে আপনি?
—আপনি আগে কই যান?
মাজেদ সাহস করে বলল
—আমি দক্ষিণ পাড়ার মাজেদ।
লোকটা বলল
—ওহ, আচ্ছা! যাক, ভালোই হইল।
—একা এই রাস্তা দিয়া যাইতে ভয় পাইতেছিলাম। আপনারে পাইয়া ভয়টা একটু কমল।
মাজেদ এবার ঘুরে তাকাল।
অন্ধকারে লোকটার চেহারা পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে না।
তবে লোকটাকে বেশ বয়স্ক মনে হলো।
লম্বা সাদা পাঞ্জাবি।
মাথায় সাদা টুপি।
দাড়ি বুক ছুঁইছুঁই।
আর সবচেয়ে অদ্ভুত
তার শরীর থেকে মিষ্টি আতরের একটা ঘ্রাণ বের হচ্ছে।
এমন ঘ্রাণ, যা অন্ধকার জঙ্গল আর ভেজা মাটির গন্ধকেও ছাপিয়ে যাচ্ছে।
মাজেদের বুকের ভেতর একটু সাহস ফিরে এল।
সে বলল
—আপনারে দেখে তো মাওলানা সাহেব মনে হয়। হুজুর, আপনি এত রাতে কই যান?
লোকটা মৃদু হেসে বলল
—এক এলাকায় মিলাদ পড়াইতে গেছিলাম। সেখানেই রাত হইয়া গেছে। বন শেষ হইলেই আমার বাড়ি। তাই এই শর্টকাট ধরছি।
—ও আচ্ছা
মাজেদ একটু চুপ করে থেকে বলল
—হুজুর, একটু আগে এই রাস্তায় অনেক অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটল। আপনে কি সেগুলা দেখছেন?
লোকটা এবার আর হাসল না।
কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলল
—দেখছি।
মাজেদের গলা শুকিয়ে গেল।
—সব সত্যি?
—যা দেখছেন, সবই সত্যি।
মাজেদ আর কথা বলল না।
লোকটা ধীরে ধীরে বলল—
—তবে এখন ওগুলা নিয়া কোনো কথা কইয়েন না। ওরা কথা শুনতে পায়।
মাজেদের বুকের ভেতর আবার কাঁপুনি শুরু হলো।
কিছুক্ষণ পর সে জিজ্ঞেস করল
—হুজুর, আপনার নামটা যদি বলতেন?
লোকটি বলল
—আবদুল হাশেম।
—ও আচ্ছা। আমি এই রাস্তা দিয়া নিয়মিত আসা-যাওয়া করি না। তাই এই দিকের কাউরে তেমন চিনি না।
লোকটা মৃদু হেসে বলল
—সমস্যা নাই মিঞা। এই দুনিয়ায় আমরা সবাই মুসাফির।”
কিছুক্ষণ থেমে আবার বলল
—চলার পথে মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়। কেউ কিছুদূর সঙ্গে থাকে, কেউ মাঝপথেই হারায়া যায়।
মাজেদ চুপচাপ শুনছিল।
হাশেম সাহেব বললেন
—আর একদিন সবাইরে এই রাস্তা ছাড়তে হইব। তারপর আল্লাহ পাকের কাছে নিজের কৃতকর্মের হিসাব দিতে হইব। পরীক্ষায় পাশ করলে বেহেশত, ফেল করলে দোজখ।
কথাগুলো শুনে মাজেদের শরীর কেমন শিউরে উঠল।
হঠাৎ হাশেম সাহেব তার দিকে তাকিয়ে বললেন
—আপনে মানুষটা খারাপ না। একটা কথা কই?
—জি হুজুর।
—বিড়ি খাওয়াটা ছাইড়া দিয়েন।
মাজেদ নিজের হাতে থাকা নিভে যাওয়া বিড়িটার দিকে তাকাল।
তারপর ঘাড় কাত করে বলল
—জি হুজুর। ছাইড়া দিমু।
কথায় কথায় তারা কখন যে বনের শেষ প্রান্তে এসে পড়েছে, মাজেদ খেয়ালই করেনি।
সামনে মেইন রোড।
হাশেম সাহেব বললেন
—আপনে এই রাস্তা দিয়া যান। আপনার বাড়ি আর বেশি দূর না।
মাজেদ বলল—
—হুজুর, আপনে কই যাবেন?
লোকটা সামনের অন্ধকার রাস্তার দিকে ইশারা করল।
—আমার বাড়িও ওই দিকেই।
মাজেদ সালাম দিয়ে মেইন রোড ধরে হাঁটা শুরু করল।
কয়েক পা যাওয়ার পর তার মনে হলো
একবার পেছনে তাকিয়ে হুজুরকে সালাম দিয়ে আসা উচিত।
কিন্তু দাদীর কথা মনে পড়তেই আর তাকাল না।
সেই রাতেই বাড়ি পৌঁছে কোনো রকমে ঘুমিয়ে পড়ল সে।
পরদিন সকাল
ঘুম থেকে উঠেই মাজেদ গত রাতের ঘটনা সবাইকে খুলে বলল।
বিড়ি নিভে যাওয়া থেকে শুরু করে সাদা বিড়াল, ঘোড়ার খুরের শব্দ—সব।
সবশেষে বলল
—আর একজন হুজুর আছিল। নাম আবদুল হাশেম।
ঘরে উপস্থিত সবাই একে অন্যের মুখের দিকে তাকাল।
কেউ কিছু বলল না।
মাজেদ অবাক হয়ে বলল
—কী হইল? আপনারা চুপ ক্যান?
মসজিদের ইমাম সাহেব তখন পাশে বসেছিলেন।
তিনি ধীরে ধীরে মাথা তুললেন।
—আপনে কইলেন নাম কী?
—আবদুল হাশেম।
ইমাম সাহেবের মুখের রং বদলে গেল।
তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন
—ওনারে আপনি চিনবেন না।
মাজেদ বলল
—ক্যান?
ইমাম সাহেব নিচু গলায় বললেন
—উনি হুজুর তবে আমাদের জগতের না।
ঘরের সবাই নিস্তব্ধ।
মাজেদ শুকনো গলায় বলল
—মানে?
ইমাম সাহেব বললেন
—প্রায় চল্লিশ বছর আগে এই গ্রামের পাশের ওই কবরস্থানের কাছে এক মাওলানা সাহেব থাকতেন। নাম ছিল আবদুল হাশেম। খুব নেক মানুষ ছিলেন। রাতে মিলাদ, ওয়াজ, কোরআনখানি পড়তে বিভিন্ন গ্রামে যাইতেন।
মাজেদ নিঃশ্বাস বন্ধ করে শুনছিল।
—এক বর্ষার রাতে ওই শর্টকাট রাস্তা দিয়ে বাড়ি ফেরার সময় উনি নিখোঁজ হন। পরদিন সকালে কবরস্থানের পাশের জঙ্গলে ওনার লাশ পাওয়া যায়।
মাজেদের চোখ বড় হয়ে গেল।
ইমাম সাহেব আরও বললেন
—তারপর থেকে মাঝে মাঝে মানুষ ওই রাস্তায় একজন বৃদ্ধ মাওলানাকে দেখছে। সাদা পাঞ্জাবি, সাদা টুপি… আর শরীর থেকে আতরের গন্ধ আসে।
মাজেদের গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না।
ইমাম সাহেব এবার বললেন
—আর একটা কথা আছে।
—কী কথা?
—যারা উনাকে দেখছে, তাদের বেশিরভাগই কোনো না কোনো বিপদ থেকে বেঁচে ফিরছে।
ঘরের সবাই স্তব্ধ।
মাজেদ তখন নিজের পকেটে হাত দিল।
গত রাতের নিভে যাওয়া বিড়িটা এখনও তার পকেটে।
সে বিড়িটা বের করে মাটিতে ফেলে দিল।
তারপর পায়ের জুতো দিয়ে মাড়িয়ে বলল
—এইডা আর খামু না।
ঠিক তখনই বাইরে থেকে বাতাসের একটা ঝাপটা এসে উঠোনের দরজাটা কড়াৎ করে খুলে দিল।
সঙ্গে ভেসে এল।
মিষ্টি আতরের গন্ধ।
মাজেদ আর কেউই কথা বলল না।
শুধু মসজিদের ইমাম সাহেব ধীরে ধীরে আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন
আল্লাহ হাশেম সাহেবের রুহের মাগফিরাত করুন।
আর সেই মুহূর্তে দূরের কবরস্থানের দিক থেকে ভেসে এল—
খুক… খুক
একটা মৃদু কাশির শব্দ।
তারপর সবকিছু আবার নিস্তব্ধ।
লেখিকা: ফাতেহা সুরভী



