৬ কেন্দ্র বন্ধ, চট্টগ্রামে বিদ্যুৎ সংকট চরমে—ঘনঘন লোডশেডিংয়ে জনজীবন বিপর্যস্ত
আরিফুল ইসলাম
শনিবার সন্ধ্যা ০৬:২৬, ১৮ এপ্রিল, ২০২৬
চট্টগ্রামের ২৮টি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের মধ্যে ৬টি বন্ধ থাকায় বিদ্যুৎ সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। বর্তমানে ২২টি কেন্দ্র সচল থাকলেও চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। নগরীতে বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি), আর বিভিন্ন উপজেলায় সরবরাহ দিচ্ছে পল্লীবিদ্যুৎ সমিতি (পবিস)।
তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নগরীতে লোডশেডিং ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। টানা এক ঘণ্টাও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ মিলছে না অনেক এলাকায়। বিদ্যুৎ না থাকায় ওয়াসার পানি সংগ্রহ ব্যাহত হচ্ছে, ফলে পানির সংকটেও পড়ছেন বাসিন্দারা।
গ্রামাঞ্চলে পরিস্থিতি আরও নাজুক। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার অঞ্চলের অনেক এলাকায় দিনে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকে না। প্রচণ্ড গরমে জনজীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। লোডশেডিংয়ের কারণে কৃষি সেচ, শিল্প উৎপাদনসহ স্বাভাবিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
নগরীর তুলনায় উপজেলাগুলোতে লোডশেডিং বেশি হচ্ছে। অনেক জায়গায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১২ ঘণ্টাও বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন গ্রাহকরা। বর্তমানে চট্টগ্রামে বিদ্যুতের ঘাটতি ২০০ মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গেছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, জ্বালানি সংকটের কারণে ছয়টি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রয়েছে। এর মধ্যে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ২, ৩ ও ৫ নম্বর ইউনিট বন্ধ রয়েছে। এছাড়া রাউজান-১ ও রাউজান-২ (প্রতিটি ২১০ মেগাওয়াট ক্ষমতার) কেন্দ্র এবং জুডিয়াকের ৫৪ মেগাওয়াট কেন্দ্রটিও উৎপাদন বন্ধ রেখেছে। গ্যাসের স্বল্প চাপ ও জ্বালানি তেলের সংকটে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে সরবরাহে।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের হিসাব অনুযায়ী, ১৫ এপ্রিল অফ-পিক সময়ে চাহিদা ছিল ১৩৮৪ দশমিক ৯ মেগাওয়াট এবং পিক সময়ে ১৪৩২ দশমিক ৭৩ মেগাওয়াট। ওইদিন অফ-পিক সময়ে ১১১ দশমিক ০৯ মেগাওয়াট এবং পিক সময়ে ১৭০ দশমিক ৭৩ মেগাওয়াট লোডশেডিং দেখানো হলেও বাস্তবে তা ২০০ মেগাওয়াটের বেশি বলে জানা গেছে।
বাংলাদেশে সাধারণত বিকাল ৫টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত পিক আওয়ার, যখন বিদ্যুতের চাহিদা সর্বোচ্চ থাকে। অন্যদিকে রাত ১১টা থেকে পরদিন বিকাল ৫টা পর্যন্ত অফ-পিক আওয়ার হিসেবে বিবেচিত হয়।
নগরীর পাথরঘাটা, আসকারদিঘির পাড়, হালিশহর, কালুরঘাট ও বায়েজিদ বোস্তামীসহ বিভিন্ন এলাকায় গত কয়েকদিন ধরে ঘনঘন লোডশেডিং হচ্ছে। দিনে গড়ে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় শিল্পাঞ্চলগুলোতে উৎপাদন প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। জেনারেটর চালিয়েও পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে।
কালুরঘাট শিল্প এলাকার একটি গার্মেন্টস কারখানার মালিক জানান, নিয়মিত লোডশেডিংয়ের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং এ অবস্থা কয়েকদিন ধরে চলছে।
এদিকে, শুক্রবার ও শনিবার (১৭ ও ১৮ এপ্রিল) নগরীর প্রায় অর্ধেক এলাকায় নির্ধারিত সময়ের জন্য বিদ্যুৎ বন্ধ রাখার নোটিশ দেওয়া হয়। নোটিশে বলা হয়, ‘উন্নয়ন, জরুরি মেরামত ও সংরক্ষণ কাজের জন্য নগরীর কিছু কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখতে হচ্ছে’। তবে অনেক গ্রাহকই এটিকে লোডশেডিং আড়াল করার কৌশল বলে মনে করছেন।
দক্ষিণ চট্টগ্রামের আটটি উপজেলাতেও পল্লীবিদ্যুতের আওতায় তীব্র সংকট চলছে। এসব এলাকায় প্রতিদিন ১২ ঘণ্টার বেশি সময় বিদ্যুৎ থাকছে না। প্রায় ৭ লাখ গ্রাহক এ সংকটে ভুগছেন।
চট্টগ্রাম বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সহকারী পরিচালক (জনসংযোগ) মো. আকবর হোসেন জানিয়েছেন, ২৮টি কেন্দ্রের মধ্যে ৬টি বন্ধ থাকায় সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হয়েছে। ফলে গত কয়েকদিন ধরে লোডশেডিং অব্যাহত রয়েছে। অফ-পিক ও পিক—উভয় সময়েই বিদ্যুৎ ঘাটতি থাকছে। পাশাপাশি কিছু এলাকায় উন্নয়ন ও মেরামত কাজের জন্যও বিদ্যুৎ সরবরাহ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হচ্ছে।


